সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩

স্বপ্ন সারথি নগরফুল

প্রকাশিত: সোমবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২২

শেখ আব্দুল্লাহ ইয়াছিন

‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট,বিশ্বাস হৃদয়ে। হবেই হবে দেখা, দেখা হবে বিজয়ে।’ গীতিকার আসিফ ইকবালের লেখা হৃদয় নিংড়ানো এই গানটি আমাদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। মানুষ তার লক্ষ্য ঠিক রেখে বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে বিজয়ের দেখা ঠিক পাবেই।

কিন্তু এই স্বপ্ন দেখা আর হৃদয়ে বিশ্বাস রাখাটা স্বাভাবিক ভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য সহজ হলেও অস্বচ্ছল, ছিন্নমূল বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্ষেত্রে তা কতখানি সহজ এবং স্বাভাবিক? যাদের নুন আনতে পান্না ফুড়ায় সেখানে স্বপ্ন দেখা কিংবা বিজয় চিনিয়ে আনতে চাওয়াটা একপ্রকার বিলাসিতায়। কিন্তু তাদেরও কি স্বপ্ন দেখতে, বিজয়ের দেখা পেতে ইচ্ছে জাগে না? অবশ্যই জাগে। তারাও স্বপ্ন দেখে। শুধু স্বপ্ন পূরণের রথ সারথি খোজে পায় না।

আমার বিশ্বাস একটুখানি সহযোগিতার হাত পেলে,পরিচর্যা পেলে তারাও বিজয় চিনিয়ে আনবে। আর এমনটা-ই প্রমাণ দেখালো সুবিধাবঞ্চিত চার শিক্ষার্থী। বলছি নগরফুল হলিডে স্কুলের চার কৃতি শিক্ষার্থীর কথা যারা বিজয় চিনিয়ে এনেছে । এইবছর ২০২০-২১শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। দারিদ্র্যতাকে পিছনে পেলে তারা প্রমাণ করেছে তারাও চাইলে পারে। আর এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এই সাফল্য এনে দিতে রথের সারথি হয়েছে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নগরফুল।

মোহাম্মদ রাকিব
গ্রামের বাড়ি বরিশালে হলেও রাকিবের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন ঘেঁষে গড়ে উঠা নতুন পাড়া কলনীতে। মা হারা সন্তান রাকিবের বাবায় সব। বাবা ।ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করে এই স্বল আয়ে চার সদস্যের সংসার চালিয়ে ছেলের পড়ালেখার ব্যয় মেটানো বাবার পক্ষে অনেকটা কষ্টসাধ্য। এরপরও পড়াশোনার প্রতি ছেলের আগ্রহ দেখে বাবা না করতে পারেন না। অনেকটা স্বাদ আছে সাধ্য নেয়ের মত পরিস্থিতি। সে সময় রাকিবের পাশে এসে দাঁড়ায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নগরফুল।

রাকিব প্রতি শুক্রবার নগরফুল হলিডে স্কুলে ক্লাস করতো। তার পড়ালেখার প্রতি ভালোবাসা ও স্পৃহা দেখে নগরফুলের বিশেষ প্রজেক্ট ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ডোনার (ওসিওডি) প্রজেক্টের আওতায় তাকে নেওয়া হয়। যার মধ্যে দিয়ে তার শিক্ষার সকল ব্যয় ভার নগরফুল বহন করে। কিন্তু পরবর্তীতে করোনার কারণে প্রজেক্টটি বন্ধ হয়ে গেলেও রাকিবকে সকল প্রকার সহযোগিতা দিয়ে যায় নগরফুল। দশম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষার পর থেকে নগরফুলের মালীরা তার বাসায় গিয়ে তাকে স্পেশাল ভাবে পড়ানো শুরু করে বিনামূল্যে।

এই বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় বিসিএসআই আর ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখা থেকে রাকিব জিপিএ পাচ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। তার ফলাফলে সন্তুষ্ট রাকিবের বাবাও। তিনি ছেলের এমন সাফল্য দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে নগরফুলের মালীদের জড়িয়ে ধরে কান্না করে কৃতজ্ঞতা জানান। রাকিব বলে- নগরফুল আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। তা কখনো ভুলার নই। আমি সবসময় নগরফুলের প্রতি কৃতজ্ঞ।

রাকিব বড় হয়ে আর্মি হতে চাই। পাশাপাশি দায়িত্ব নিতে চাই বাবারও। তার স্বপ্ন পূরণে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে নগরফুল। এর আগে রাকিব জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিল।

প্রিয়া আক্তার

প্রিয়ার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে হলেও বেড়ে ওঠা আজিজ মিয়ার গোডাউন এলাকায়। প্রিয়ারা তিন বোন। । বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট বোন এবার অষ্টম শ্রেণিতে। প্রিয়া মেজ। বাবা শূন্য পরিবারে মা-ই সব তাদের। মা মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। টানাটানির সংসারে দুই মেয়ের পড়ালেখা চালানো সহজ বিষয় নয়।

কিন্তু প্রিয়া স্বপ্নের পিছে ছুটতে চাই, বড় হতে চাই। তার সে স্বপ্নের পতাকা উড়ানোর সঙ্গী হয় নগরফুল। তার পড়ালেখার দায়িত্ব ভার তোলে নিয়ে তার পাশে দাঁড়ায় তারা। এসএসসি পরীক্ষার আগে নগরফুলের ভাইয়া আপুরা তার বিশেষ যত্ন নেন। তার স্বপ্ন পূরণে তাকে ভর্তি করিয়ে দেন একটি কোচিং সেন্টারে।

কে.বি. দোবাস সিটি কর্পোরেশন গার্লস স্কুল থেকে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে সে এবার জিপিএ ৪.৯৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। সে আগ্রাবাদ কমার্স কলেজে পড়তে চাই। ব্যবসায় শিক্ষায় পড়লেও তার স্বপ্ন সে বড় হয়ে আইনজীবী হবে।

প্রিয়া বলে- নগরফুল আমার পড়ালেখা করার জন্য আর্থিক সহ নানা ভাবে সহযোগিতা করেছে। পরীক্ষার আগে আমার খোজ খবর নিয়েছে। পরীক্ষায় রেজাল্ট দেওয়ার পর ভাইয়া আপুরা দেখা করতে এসেছেন এবং কলেজে ভর্তির জন্য সব ধরনের সাহায্য করবেন বলেছেন।

প্রিয়া পড়ালেখায় পারদর্শী শুধু তাই নয় সেভালো আবৃত্তিও করে। নগরফুলের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে অংশগ্রহণ করে।

মোহাম্মদ জসিম

পরিবারের বড় সন্তান জসিম। অসুস্থ বাবা ফার্ণিচার মিস্ত্রি। একদিন কাজ করতে পারলে অন্যদিন কাজে যেতে পারেন না। গত ১০দিনে তিনি অসুস্থতার কারণে কাজে যেতে পারেননি। মা মানুষের বাসায় কাজ করেন। তা দিয়ে অভাব অনটনের সংসার ভালো ভাবে চলে না সেখানে পড়াশোনা!

তাই বড় ছেলে হিসেবে এই বয়সে পরিবারের দায়িত্ব কাধে তোলে নিয়েছে সে। অদম্য আগ্রহ এবং চেষ্টা তাকে স্বপ্নের পথ হতে টলাতে পারেনি। কয়েকটি টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে সে। প্রতি শুক্রবার নগরফুল হলিডে স্কুলে ক্লাস করে সে। তার সাথে তার ছোট ভাইও পড়তে আছে নগরফুল হলিডে স্কুলে।

পড়ালেখার পাশাপাশি জসিম ভালো গান করে। নগরফুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও সে অংশ নেয়। তাদের স্কুলে এবার বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানের বিভাগে সে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করে।

এবার অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় পটিয়া শাহ আমির উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা হতে জিপিএ ৪.২২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় সে। তার স্বপ্ন সে বড় হয়ে টিচার হবে। জসিম জানায়- নগরফুল থেকে আমি বই খাতা পেয়েছি। ভাইয়ারা আমাকে কলেজে ভর্তির জন্য সহযোগিতা করবেন বলেছেন।

ঊষা আক্তার

ঊষার মন খারাপ।শাহ আমিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগ থেকে সে জিপিএ ৩.০৬ পেয়েছে। প্রত্যাশিত ফল না আসায় সে কান্নাকাটি করছে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়া হলো। বুঝানো হলো এই ফলাফল জীবনের কিছু নয়।অনেকক্ষণ পর সে শান্ত হলো। বললো ভাইয়া রেজাল্টটা আরেকটু ভালো হলে ভালো কলেজ ভর্তি হতে পারতাম তাই না।

পটিয়া কামাল কোম্পানির বাড়ি এলাকায় উষাদের বাসা। তারা দুই বোন এক ভাই। ঊষা সবার ছোট। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে । ঊষার বাবা রিক্সশা চালিয়ে একাই চার জনের পরিবার চালান। ঊষাকে প্রশ্ন করলাম- তোমার স্বপ্ন কি?

উত্তরে বললো ভাইয়া আমি যতটুকু সুযোগ পায় ততটুকু পড়তে চাই। ঊষা জানায় – নগরফুলের ভাইয়া আপুরা তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নানাভাবে সাহায্য করে, অনুপ্রেরণা দেয়। পরীক্ষার আগে ভাইয়ারা আমাকে আলাদা ভাবে পড়াইছে। রেজাল্টের পর কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবেন আশ্বাস দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে নগরফুল তার জন্মলগ্ন থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জীবন মান উন্নয়নের লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে। তার ধারাবাহিকতায় তারা নানা রকম প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। যেমন প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে কুমিল্লা সহ চট্টগ্রামের ৭টি পয়েন্টে ৮ শতাধিক শিশুকে নিয়ে নগরফুল নিয়মিত কার্যক্রম ‘নগরফুল হলিডে স্কুল’ পরিচালনা করছে। এর মাধ্যমে মূলত ছুটির দিনে শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদান করেন নগরফুলের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকরা।

এ ছাড়াও নগরফুল চালু করেছে ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ডোনার(ওসিওডি) প্রজেক্ট। এই কার্যক্রমের আওতায় শিশুদের জীবন মান উন্নয়নে নগরের বিত্তবান ব্যক্তিরা একজন শিশুর দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। বর্তমানে এ প্রজেক্টের আওতাধীন ১৭ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু রয়েছে।

এ ছাড়াও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের একাধিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করিয়ে তাদের প্রতিভাকে বিকশিত করছে নগরফুল কালচারাল টিম। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বাসস্থান নিশ্চিতকরণে ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা, সেই সঙ্গে তাদের পরিবারকে নিজস্ব বাসস্থানের উপকরণ জোগাড়ের ব্যবস্থাও করার লক্ষ্য ‘নগরফুল স্বাবলম্বী প্রজেক্ট’ চালু করা হয়েছে।

পথশিশুদের স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দিয়ে নগরফুল ভলন্টিয়ারদের মধ্যে মেডিকেলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব হেলথ টিম। এই টিম নিয়মিত বিনামূল্যে নগরফুলদের মাঝে চিকিৎসা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে।

ঈদকে সামনে রেখে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে ‘সবার আগে ঈদের সাজে সাজবে নগরফুল’ নামে একটি ঈদ ইভেন্ট ও শীতে ‘শীত আসবে শিশু হাসবে উষ্ণতার পরশে ‘ ব্যানারে শীতবস্ত্র বিতরণ করে যাচ্ছে নগরফুল টীম।

আরো পড়ুন