শনিবার, ২৮ মে ২০২২

যাত্রাপথে প্রসূতির মৃত্যু : জরুরী রোগী পারাপারে ভোগান্তি

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, মে ১২, ২০২২

সাজিদ মোহন, সন্দ্বীপ::

সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম নেওয়ার সময় যাত্রাপথে চট্টগ্রামের কুমিরায় প্রাইভেট কারে কুলসুমা বেগম (৩০) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার ১১ মে সকাল ৯.৩০ দিকে মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়। কুলসুমা বেগম সন্দ্বীপ পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের আবুল হোসেন পন্ডিতের বাড়ির বাসিন্দা।

নিহতের সঙ্গে থাকা তিন জন আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অসুস্থতার লক্ষণ দেখা গেলে রাত ১টার দিকে রোগীকে স্থানীয় সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টার আনা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রাত ৩টায় রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন। রাত ১ টা থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত মেডিকেলে ও গুপ্তছড়া ঘাটে রেগীকে নিয়ে অপেক্ষা করারর পর সকাল ৭.৩০ এর দিকে স্টিমারে ওঠেন তারা। স্টিমার থেকে কুমিরা ঘাটে নেমে প্রাইভেট কারে ওঠার পর ৯.৩০ এর দিকে কুলসুমা বেগমের মৃত্যু হয়।

অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দায়ী করে মৃত কুলসুমা বেগমের স্বামী মোঃ সাইফুল বলেন, ‘দ্রুত যদি আমার স্ত্রীকে চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে বাঁচাতে পারতাম।’

সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারের ম্যানেজার শরীফ সাইফ উল্লাহ বলেন, ‘রাত ৩.৩০ এর দিকে রোগীকে মেডিকেলে আনা হয়। রোগীর প্রেসার খুব কম ছিল, পালস ছিলো না। আমাদের গাইনী ডাক্তার চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে আমরা চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিই। ভোর ৪ টার দিকে স্বজনদের সঙ্গে রোগী মেডিকেল থেকে চলে যায়।’

সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট খীসা বলেন, ‘রোগী পারাপারের জন্য গুপ্তছড়া ঘাটে সার্বক্ষণিক একটা লাল বোট( লাইফ বোট) থাকে। লাল বোটে করে রোগীকে দ্রুত চট্টগ্রাম না নিয়ে গিয়ে শীপের জন্য সময় ক্ষেপণ করলে আমাদের করার কি আছে?’

চট্টগ্রামের জলবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের সঙ্গে চট্টগ্রামের মূল ভূখন্ডের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ৫০০ যাত্রী ধারনক্ষমতা সম্পন্ন একটি মাত্র সরকারি জাহাজ ‘আইভি রহমান’। জাহাজটির পাশাপাশি যাত্রী পারাপারের জন্য রয়েছে কয়েকটি ইন্জিন চালিত কাঠের নৌকা(সার্ভিস বোট)। পারাপারে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘন্টা। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার যাত্রী সন্দ্বীপ- চট্টগ্রাম আসা যাওয়া করেন কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌ রুটে।

সাধারন যাত্রী পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে দ্রুত জরুরী রোগী পারাপারের জন্য নেই কোন বিশেষ ব্যবস্থা। সন্দ্বীপের অভ্যন্তরীণ অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিনই উন্নত চিকিৎসার জন্য একাধিক সংকটাপন্ন রোগীকে পাঠাতে হয় চট্টগ্রামে। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু, বৃদ্ধ ও দূর্ঘটনায় আহত মুমূর্ষু রোগী। সাধারন যাত্রীদের মত সংকটাপন্ন এসব রোগীকেও গুপ্তছড়া ঘাটে এসে নদী পারাপারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। জাহাজ ও ইন্জিন চালিত কাঠের নৌকা(সার্ভিস বোট) ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় সূচীর পরে ঘাটে পৌঁছলে অনেক সময় সম্ভব হয় না জরুরী রোগী পারাপারও।

গুপ্তছড়া ঘাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সুমন আক্ষেপ করে বলেন, ‘সন্দ্বীপ চ্যানেল পার হয়ে চট্টগ্রাম যেতে না পারায় গুপ্তছড়া ঘাটেই সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটেছে গত ২০ এপ্রিল। এ ঘটনায় দুই নবজাতকের একজন মারা গেছে। এর আগেও কয়েকবার এরকম ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম যেতে না পারায় চিকিৎসার অভাবে মুমূর্ষু রোগীদের মৃত্যুর অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে গুপ্তছড়া ঘাটে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও সন্দ্বীপের মানুষকে এখনও মধ্যযুগীয় কায়দায় যাতায়াত করতে হয়।’

ভূক্তভোগী একাধিক রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেলা সংকটাপন্ন রোগীকে (বিশেষ করে গর্ভবতী, নবজাতক, বৃদ্ধ, দূর্ঘটনার আহত) কোনমতে চট্টগ্রাম পাঠানো গেলেও রাতের বেলায় চলে না সরকারী জাহাজ। তখন একমাত্র ভরসা ইন্জিন চালিত কাঠের নৌকা(সার্ভিস বোট) ও লাল বোট(লাইফ বোট)। জনপ্রতি ইন্জিন চালিত কাঠের নৌকার(সার্ভিস বোট) নিয়মিত ভাড়া ১৫০ টাকা হলেও রাতের বেলায় জরুরী রোগী পারাপারের জন্য ভাড়া গুনতে হয় ১৩-১৫ হাজার টাকা। অনেকের পক্ষে বড় অঙ্কের এ ভাড়া বহন করা সম্ভব হয় না।

ভূক্তভূগী রোগীর একজন আত্মীয় আবু নাসের বলেন, ‘২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় আমার মামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় স্বর্ণদ্বীপ ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। গুপ্তছড়া ঘাটে যোগাযোগ করলে ঘাট কর্তৃপক্ষ রাতের বেলা কোন নৌযান ছাড়া সম্ভব নয় বলে জানায়। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি ইন্জিন চালিত কাঠের নৌকার (সার্ভিস বোট) মাধ্যমে রাত ১২ টার পর রোগীকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়।’

অথচ সন্দ্বীপ- চট্টগ্রাম নৌ-রুটে জরুরী রোগী পারাপারের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দুই দফায় দেওয়া হয়েছিল দুটি সি অ্যাম্বুলেন্স। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটি পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি পড়ে আছে হারামিয়া ১০ শয্যা হাসপাতালের জঙ্গলের ভেতর, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সি অ্যাম্বুলেন্সটি অযত্নে পড়ে আছে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর।

উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য ২৫ লাখ টাকায় কেনা একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স দেয়। ওই বছর ১৭ এপ্রিল অ্যাম্বুলেন্সটি বুঝিয়ে দেওয়া হলেও কোন চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি জ্বালানও খরচের বিষয়েও ছিল না নির্দেশনা। ২০১৫ সালে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকায় কেনা আরেকটি সি- অ্যাম্বুলেন্স উপজেলা প্রশাসনের অধীনে দেওয়া হয়। আগেরটির মতো এটার জন্যও চালক আর জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে একদিনের জন্যও রোগী পারাপার করেনি এই সি- অ্যাম্বুলেন্সটি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলুল করিম বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সি – অ্যাম্বুলেন্সটি সন্দ্বীপ চ্যানেলে চলাচলের উপযোগী নয়। এটি হাওর অঞ্চলের জন্য উপযোগী। মন্ত্রণালয় যদি এই চ্যানেলের উপযোগী কোন সি অ্যাম্বুলেন্স দেয় এবং সাথে ড্রাইভার, হেলপার ও জ্বালানীর ব্যবস্থা করে তাহলে কম সময়ে জরুরী রুগী পারাপার করা সম্ভব হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট খীসা বলেন, ‘দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে সি অ্যাম্বুলেন্সটি দেওয়া হয়েছে, সেটি সন্দ্বীপ চ্যানেলে প্রচুর ঢেউয়ে চলার উপযোগী নয়। প্রচন্ড ঢেউ মোকাবেলার সামর্থ্য অ্যাম্বুলেন্সটির নেই। এগুলো হাওর অঞ্চলে চলার উপযোগী।’

জরুরী মুহূর্তে সংকটাপন্ন রোগীকে চট্টগ্রাম নেওয়ার কী ব্যবস্থা আছে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন,’জরুরী রোগী পারাপারের জন্য ঘাটে সার্বক্ষণিক একটি লাল বোট আছে। লাল বোট (লাইফ বোট) ছাড়া আপাতত অন্য কোন উপায় নেই। সি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যাপারে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বলেছি, অ্যাম্বুলেন্সটি অকেজো পড়ে আছে। এটা নিয়ে গিয়ে অন্য ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।’

সমাজকর্মী শামসুল আজম মুন্না বলেন, ‘ সার্ভিস বোটে (ইন্জিন চালিত কাঠের নৌকা) ও লাল বোটে(লাইভ বোট) চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ যেতে দেড় ঘন্টার বেশি সময় লাগে। দ্রুত জরুরী রোগী পারাপারের জন্য এটি কোন সঠিক ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। মুমূর্ষু রোগীর বেলায় এই দেড় ঘন্টা সময় ক্ষেপণ ভিন্ন কিছু নয়। জরুরী রোগী পারাপারের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালক ও জ্বালানীর ব্যবস্থাসহ সন্দ্বীপ চ্যানেলে চলাচলের উপযোগী দুটি সি অ্যাম্বুলেন্স দিতে হবে।’

আরো পড়ুন