শনিবার, ২৮ মে ২০২২

নবজন্ম

প্রকাশিত: বুধবার, মে ১১, ২০২২

সাফায়াত খান

র‍্যাব হাতদুটোকে দুপাশ থেকে শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে কালো জীপে তুললো। আমার তখন মনে হলো শরীরটা হালকা পালকের মত হয়ে গেছে। ভয়ে মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণের মধ্যে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো। গাড়িটা চলার পর খেয়াল করলাম রাস্তার দুই পাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। কিছুক্ষন আগেও উজ্জ্বল আলো ছিল। নিশ্চয়ই লোড শেডিং চলছে। অন্ধকারে গাড়ির ভেতরের র‍্যাব সদস্যদের কেমন ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। ওদের কুচকুচে কালো পোশাক অন্ধকারের সাথে মিশে আছে। গাড়ির ভেতরকার পরিবেশটা অসহ্য লাগছে। কি কারণে র‍্যাব আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে আমি জানিনা। হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর নৃশংসতা আমি দেখিনি। সিনেমা,সাহিত্যে, ডকুমেন্টারিতেই আঁচ করতে পেরেছি নৃশংসতা কিন্তু ৭১ এর ঘাতক আলবদর বাহিনী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের অমানবিক নিষ্ঠুরতা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। হয়তো ক্ষণিক বাদে আমি তেমন নিষ্ঠুরতার শিকার হবো।কেউ জানবেনা আমি কোথায়। র‍্যাবের কথা মনে হলে আমার কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরামুলের কথা মনে পড়ে। মোবাইল ফোনে ওর মেয়ের কন্ঠস্বর সবার মত আমাকেও কষ্ট দিয়েছিল। এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে আমার পরিণতি একরামুলের মত নয়তো পুলিশের ও.সি’র গুলিতে নিহত সিনহার মত হবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পিঠে গুলি করবে আর আমি ছটফট করতে করতে মারা যাবো।

এক জায়গায় এসে গাড়ি থামলো। জায়গাটা খুব নিরিবিলি। একজন আমাকে বললো- নামেন।
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মাথায় কালো স্কার্ফ বাধা র‍্যাব সদস্যকে আমার পাইরেটস অব দ্যা ক্যারেবিয়ান ছবির ‘ক্যাপটেন জ্যাক স্পারো’র মত ধূর্ত মনে হচ্ছিল। তার মুখের এক্সপ্রেশন বলছিল ‘ তোমাকে নিয়ে আমি কতক্ষণ খেলবো তারপর ঘুম পাড়িয়ে দেব সোনা ‘। গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম সামনে পাহাড়। আমরা পাহাড়ের নিচে। একটা দমকা হাওয়া শুকনো পাতা উড়িয়ে হিমেল হাওয়া গায়ে জড়িয়ে চলে গেল। গাড়ির মধ্যে বাকী র‍্যাব সদস্যরা বসে আমার দিকে নজর রাখছে। আমি ওদের খর দৃষ্টির কাছে হার মেনে চোখ ফিরালাম নিচের দিকে। গাড়ি থেকে একজন অফিসার নেমে এলেন। খুবই স্মার্ট মনে হলো ইয়ং অফিসারকে। সরাসরি আমার কাছে এসে বললো- যা বলবো উত্তর দেবেন প্রশ্ন করবেন না।

আমি অফিসারের মুখটিকে খুঁটে খুঁটে দেখছিলাম, বলা যায় মানচিত্র দেখার মত করে দেখছি। আলো আঁধারি পরিবেশের মধ্যে উনি একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলেন। মনে হলো তার এক চোখ সিগারেটের ডগায় আরেক চোখ আমাকে আপাদমস্তক গিলে খাচ্ছে। হতে পারে শরীরের কোন অংশে তপ্ত শীষার অঙ্গারটি বিদ্ধ করাবে সেটাই খুঁজছে। ধাতব দিয়াশলাই জিপ্পোর জলন্ত শিখার কাঁপা কাঁপা আলোয় অফিসারের মুখ আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম কিন্তু তার অভিব্যক্তিতে আমি তেমন নিষ্ঠুরতা খুঁজে পেলাম না। ওয়েস্টার্ন ছবির নায়কের মত খুট করে লাইটারটা বন্ধ করলো। আড় চোখে আবার তাকালো। বুক থেকে মনে হলো ভারী কিছু একটা একটু সরেছে।

অন্ধকার একটু একটু দূরে ঠেলে চাঁদের আলোয় আলোকিত হচ্ছে চারপাশ। এতক্ষণ মেঘের আড়ালে ছিল চাঁদ। নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে কবরের নিস্তব্ধতা। মৃত্যুর পূর্বক্ষনে প্রকৃতি বোধ হয় এমনই রঙ ধারণ করে। মাথার উপর দিয়ে একটা অচেনা পাখি অদ্ভুত শব্দ করে উড়ে গেল। কালো গাড়ির ভেতরে কয়েকজন র‍্যাব সদস্য গাড়ির বাইরে অফিসার আর আমি।

– আসুন। গলার স্বরটা কেমন অন্যরকম মনে হলো কিছুক্ষণ আগের কন্ঠস্বরের সাথে মিল খুঁজে পেলাম না। অফিসার সামনের দিকে এগুচ্ছে। আমার পা দুটো কেমন ভারী মনে হচ্ছে। আমি তার পেছনে হাটছি। কিছুদূর এগিয়ে একটি গাছের নিচে অফিসার থামলেন। আমার দিকে ঘুরে মুখোমুখি হলেন। গাছের নিচে
একটু অন্ধকার। অফিসারের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা। আমাকে নিয়ে আসা গাড়ির দরজা খোলার শব্দ হলো। বুটের শব্দ শুনে বুঝলাম গাড়ি থেকে সবাই নামছে। সিগারেটের আগুন জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠছে এক-এক বার। খুব আয়েশ করেই সিগারেট টানছে অফিসার। এই সিগারেটের আয়ুর সাথে আমার আয়ুর সম্পর্ক আছে কিনা জানিনা। কিছুক্ষণ পরেই সিগারেটের শেষ অংশটা ছুঁড়ে ফেলবেন অফিসার আর তখুনি শেষবারের মত ‘ ধুপ ‘ করে একটি শব্দ শোনার অপেক্ষায় আমি। সেই দৃশ্যটা কল্পনা করছি আমি। আবার ভাবছি- আমিতো কোন অন্যায় করিনি আমাকে কেন মারবে? পরক্ষণেই ভাবছি তাহলে এখানে নিয়ে এলো কেন? এক একটা মূহুর্ত কেটে যাচ্ছে। মৃত্যুও পা পা করে এগিয়ে আসছে।
– মহিলার সাথে আপনার সম্পর্ক কী?
– দেশের বাইরে যাচ্ছিলাম। বিমানে উনি আমার সহযাত্রী ছিলেন, আমরা পাশিপাশি বসেছি। উনি ইমিগ্রেশনের দেয়া প্যাসেঞ্জার কার্ডটি আমাকে দিয়ে বললেন দয়া করে আমি যেন পাসপোর্ট দেখে পূরণ করে দেই। আমি দ্রুতই ফরমটা পূরণ করে দিলাম। সেই থেকে পরিচয়। বিমান থেকে নেমে এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে উনি আমাকে বেশ আপ্যায়ন করালেন এবং ধন্যবাদ জানালেন। ভদ্র মহিলা কক্সবাজার থাকেন। সেদিন বিদায় নেবার সময় বলেছিলেন কখনো কক্সবাজার এলে তাকে যেন একটা ফোন করি। তার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। কাকতলীয় ভাবে আজ একজনের নাম্বার খুঁজতে গিয়ে উনার নাম্বার দেখে ইচ্ছে হলো ভদ্রমহিলার খোঁজ নেই। ফোনে পেয়ে গেলাম। গতকালই ফিরেছেন কক্সবাজারে। উনি বললেন আমার সাথে দেখা করবেন। আমি বললাম আমি মোটেল শৈবালের রেস্টুরেন্টে। উনি বললেন। উনি কাছেই আছেন। পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে যাবেন। ঠিকই পাঁচ মিনিট পরে উনি এলেন। আমি কফির অর্ডার দিয়ে কুশল বিনিময় করছি তখনই র‍্যাব আমাদের টেবিলের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে। কয়েকজন র‍্যাবের নারী সদস্য দ্রুত উনাকে ধরে বাইরে নিয়ে গেলেন। ওরা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলে আরো কয়েকজন এসে আমাকেও ধরে বাইরে নিয়ে আপনার জিপে তুলেছে।
– আচ্ছা দেশের বাইরে কোথায় গিয়েছিলেন। কখন?
– মালয়েশিয়া। তিন মাস পূর্বে। ২৬ মার্চ।
ওয়াকিটকিতে কি বার্তা এলো কে জানে কথা থামিয়ে অফিসার বললেন
– গাড়িতে গিয়ে বসুন।
আমি ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। গাড়ির ভেতরে কেউ নেই। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপে মশগুল। আমাকে দেখে চুপ হয়ে গেল।
– স্যারকে ফোন করে নাই?
– কখন করে কে জানে? ফোন আইলেতো ডিউটি শেষ।
র‍্যাবের সদস্যের কথোপকথন শুনে আমার শরীরের লোম গুলো খাড়া হয়ে গেল। ওরা কী আমাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললো? ফোনের অপেক্ষায় মানে? ফোন এলেই আমাকে গুলি করবে। তারপর ওদের আজকের ডিউটি শেষ। অস্বস্তি লাগছে। মেঘের আড়ালে ঢেকে গেল চাঁদ। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। বুকের ভেতর তোলপাড় হচ্ছে। মনে হচ্ছে অফিসারের ফোনটা বুঝি এখনই বেজে উঠবে।
শৈবাল রেস্টুরেন্টে কেন যে মহিলাকে আসতে বললাম। আর কেনই বা মহিলাকে ফোন করলাম। কোন কুক্ষণে তার সাথে বিমানে পরিচয় হলো।
র‍্যাব মহিলাকে ধরেই দ্রুত গাড়িতে উঠিয়ে নিল। লোকে বলাবলি করছিল ” ইয়াবা কুইন ” কেউ বলছে ” গড মাদার ” নানা উপমা ছুঁড়ে বেশ মজা পাচ্ছে। ভেতরে বাইরে লোকের জটলা, কয়েকটি টিভি চ্যানেলও এসেছে। তার মানে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল মহিলা। মহিলাকে নিয়ে চলে গেলে ভীড় কমে যায়, সাদা পোশাকের সশস্ত্র লোকগুলি আমাকে র‍্যাবের আরেকটি গাড়িতে তুলে নেয়। মহিলা কি জন্য দেখা করতে চেয়েছে? উত্তরটা জানা হলোনা। গলায় হাতে কানে হীরের অলংকার দামী পারফিউম পঞ্চাশোর্ধ মহিলার মুখটি ভেসে উঠলো। যখন এসব ভাবছিলাম তখনই দেখলাম অফিসার ফিরে আসছে। গাড়িতে উঠা মাত্রই চলতে শুরু করলো। অন্ধকার পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছে গাড়ি। শহরের ব্যস্ততা দৃশ্যমান হচ্ছে। নিয়ন বাতির ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত চারপাশ। বুকের ভেতরকার অস্থিরতা একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। ইচ্ছে হচ্ছে গাড়ি থেকে নেমে বুক ভরে শ্বাস নেই। তখুনি গাড়িটা থেমে গেল। একজন সিপাহি গাড়ি থেকে নামতে বললো। রাস্তার একপাশে ফুটপাতে নামতেই গাড়িটা ছেড়ে দিল। সামনের সিটে বসে থাকা অফিসার ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকালেন। চোখাচোখি স্থায়িত্ব হলো কয়েক মূহুর্ত। চলমান কালো জীপটি দ্রুত মিলিয়ে গেল ব্যাস্ত সড়কের গাড়ির ভিড়ে।

উল্লেখ্য লেখক সাফায়েত খান গত ৮ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন। আমরা লেখকের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

আরো পড়ুন