বুধবার, ১০ অগাস্ট ২০২২

দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল: ছায়াহীন এতিম এক ইউনিটের গল্প

প্রকাশিত: রবিবার, জুলাই ২৪, ২০২২

বিশেষ প্রতিবেদক::

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এক সময় ছিল বিএনপির ঘাঁটি। এই জেলার সংসদীয় ৬ আসনের প্রায় সবকটিতে বিভিন্ন সময়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা‌‌। কারণ জেলা ও ইউনিটে দলীয়ভাবে ছিল এক শক্তিশালী কমিটি ও অবস্থান।

কিন্তু ২০০৮ সালে বিএনপি বিরোধী দলে আসার পর থেকে তা কমতে শুরু করে। বাড়তে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপ ও উপগ্রুপ। ফলে দিন দিন সাংগঠনিকভাবে পঙ্গু হয়ে উঠে এক সময়ের শক্তিশালী এ ইউনিট।

বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসাবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। কিন্তু বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম দক্ষিণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি সংগঠনটি। কখনো চলে আহবায়ক কমিটি দিয়ে আবার কখনো সুপার ফাইভে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় দলীয় অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে।

যার ফলে বিগত এক যুগ ধরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পরও জুটেনি কারো কোনো দলীয় পরিচয়। জেলার পাশাপাশি থানা উপজেলা ও কলেজ পর্যায়ে যারা রাজনীতি করেছেন তারাও বিদায় নিয়েছেন গ্রুপিংয়ের রাজনীতির বলী হয়ে পদহীনভাবে।

সর্বশেষ ২০০২ সালের নভেম্বরে ছাত্রদল নেতা মহসিন চৌধুরী রানাকে সভাপতি ও রেজাউল করিম নেছারকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। এরপর আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি।

এরপরে ২০১১ সালে ছাত্রদল নেতা জসিম উদ্দিনকে আহ্বায়ক এবং শহীদুল ইসলাকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে প্রথমে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছিল। পরে আহ্বায়ক কমিটিকে ২০৫ সদস্যে উন্নীত করা হয়েছিল। তখন থেকেই শুরু হয় দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের শনির দশা। সাত বছরেও তারা আহ্বায়ক কমিটি থেকে জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি।

পরবর্তী ২০১১ সালের পর ২০১৮ সালের ১ আগস্ট নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে শহীদুল আলম শহীদকে সভাপতি, ইকবাল হায়দার চৌধুরীকে সিনিয়র সহ সভাপতি, মো. মহসিন সাধারণ সম্পাদক, কেএম আব্বাস যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং গাজী মোহাম্মদ মনিরকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির অনুমোদন দেয় তৎকালীন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। এই কমিটি চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি বাতিল করে দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।

কিন্তু পাঁচ সদস্যের এ কমিটি প্রায় সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন করলেও তারাও জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। কারণ তৎকালীন সভাপতি শহিদুল আলম শহিদ ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ মহসিনের দুই গ্রুপে বিভক্ত ছিল। তাঁরাও নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং আর মাইম্যান তৈরি করতে গিয়ে জেলা কমিটি গঠন করতে পারেনি।

তবে এর পিছনে মুরব্বি সংগঠন বিএনপিও কম দায়ী নয় বলে মনে করছেন ছাত্রদল নেতারা। তাদের দাবি, চট্টগ্রাম দক্ষিণে জসিম উদ্দিন ও শহিদুল ইসলামকে নিয়ে করা আহ্বায়ক কমিটি ব্যর্থ হওয়ার পিছনে মূল কারিগর ছিল তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েল। তারা দুই নেতার দুই বলয় ছিল দক্ষিণের সব ইউনিটে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রনেতারা সেভাবে কাজ করতে পারেননি।

একইভাবে শহিদুল আলম ও মোঃ মহসিন কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে না পারার জন্য দায়ী উপজেলা কমিটিতে নিজেদের লোককে পদে আনার জন্য তৎপরত। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক মোঃ মহসিনের নিজ এলাকা সাতকানিয়া উপজেলায়ও নিজের লোক আনতে তৎপর ছিল সভাপতি শহিদ। ফলে ভাগবাটোয়ারায় না মিলাতে কোন কমিটিই করতে পারেননি তারাও। তবে এর পিছনেও দায়ি ছিল মূল দল বিএনপির নেতারা-এমন অভিযোগ পদবঞ্চিত নেতাদের।

এরপরও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠন হওয়ার খবরে শীর্ষ দুই পদে প্রার্থী হয়েছেন প্রায় শতাধিক ছাত্রনেতা। কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে, আহ্বায়ক কমিটি হবে বা নতুন কমিটি হচ্ছে, হবে তে এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে তিন বছরের অধিক সময়।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন কমিটি আদৌ হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন শীর্ষ পদের প্রার্থীরা।

নতুন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে যারা ফরম জমা দিয়েছেন তারা হলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীমের অনুসারী আনোয়ারার আবদুল ওয়াহেদ সুমন, আনোয়ারা আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সরোয়ার জামাল নিজামের অনুসারী ওহিদুল ইসলাম ওহিদ, বোয়ালখালী আসনের বিএনপি নেতা নগর বিএনপির ১নং সদস্য এরশাদ উল্লাহর অনুসারী জিয়াউল হক জুনাইদ, সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর অনুসারী বাঁশখালীর ফরহাদুল ইসলাম, সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যানের অনুসারী নাঈমুল আলম খোকন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তাক আহমদ খান অনুসারী আরেফিন রিয়াদ।

এছাড়াও সদস্য সচিব পদে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এনামুল হক এনামের অনুসারী পটিয়ার রবিউল হোসেন রবি, পটিয়ার সাবেক এমপি গাজী শাহজাহান জুয়েলের অনুসারী এএম তারেক রহমান, সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর অনুসারী আবদুস সবুর, সাবেক ছাত্রনেতা বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা লেয়াকত আলীর অনুসারী দিলদার হোসেন রানা, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাসের অনুসারী মোঃ সালাউদ্দিন, আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের অনুসারী ইসমাইল বিন মনির।

কবে নাগাদ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের কমিটি হতে পারে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, সেপ্টেম্বরের দিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কমিটি গঠন করা হতে পারে। এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ ও ঢাকার জেলা কমিটি গঠন করা হবে।

আশা করি আগামী নভেম্বরে সারাদেশের ইউনিট কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ।

সার্বিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আরো পড়ুন